মক্কা বিজয়: বিশ্বনবীর (সা) দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা ও শান্তিকামীতার সাক্ষ্য

মক্কা বিজয় ইসলামের ইতিহাসের এক অতি আকর্ষণীয় অধ্যায়। আবার একই সাথে তা শিক্ষণীয় এবং তা মহানবী (সা.)-এর পবিত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো এবং তাঁর মহান চরিত্র স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ইতিহাসের এ অধ্যায়ে হুদায়বিয়ার সন্ধিতে যে সব বিষয় সম্পর্কে স্বাক্ষর করা হয়েছিল, সেসবের প্রতি মহানবী (সা.) এবং তাঁর অনুসারীগণের বিশ্বস্ততা স্পষ্ট হয়ে যায়, আর এর বিপরীতে হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রের ধারাগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কুরাইশ বংশীয় মুশরিকদের কপটতা ও বিশ্বাসঘাতকতাও পরিষ্কার হয়ে যায়।

ইতিহাসের এ অধ্যায় অধ্যয়ন ও মূল্যায়ন করলে শত্রুর সর্বশেষ ও সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি জয় করার ক্ষেত্রে মহানবীর দক্ষতা, পরিকল্পনা,কর্মকৌশল এবং বিজ্ঞজনোচিত রাজনীতি প্রমাণিত হয়ে যায়। এমন প্রতীয়মান হয় যে, এ পবিত্র ব্যক্তিত্ব তাঁর জীবনের একটি অংশ এক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছেন এবং একজন চৌকস সমরাধিনায়কের মতো বিজয়-পরিকল্পনা এমনভাবে প্রণয়ন করেছেন,যাতে মুসলমানরা অনায়াসে সর্ববৃহৎ বিজয় অর্জন করেছিল।

অবশেষে এ অধ্যায়ে রক্তপিপাসু শত্রুদের জীবন ও ধন-সম্পদ রক্ষার ব্যাপারে মহানবীর মানব দরদী চরিত্র স্পষ্ট হয়ে যায়। এ মহামানব বিশেষ বিচক্ষতা দিয়ে এ মহান বিজয় অর্জিত হবার পর কুরাইশদের যাবতীয় অপরাধ উপেক্ষা করেন এবং সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন।

মক্কা বিজয়ের পটভূমি

হিজরতের ষষ্ঠ বর্ষে কুরাইশ নেতৃবর্গ ও মহানবী (সা.)-এর মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির তৃতীয় ধারা মোতাবেক মুসলমান ও কুরাইশরা যে কোন গোত্রের সাথে মৈত্রীচুক্তি করতে পারবে। এ ধারার ভিত্তিতে খুযাআহ্ গোত্র মুসলমানদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয় এবং মহানবী তাদের জীবন, ধন-সম্পদ এবং ভূ-খণ্ড রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর বনী কিনানাহ্ গোত্র, যারা খুযাআহ্ গোত্রের পুরানো শত্রু এবং প্রতিবেশী ছিল, কুরাইশ গোত্রের সাথে সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়। দশ-সালা ওই চুক্তি আরব উপদ্বীপের সমুদয় অঞ্চলে সামাজিক নিরাপত্তা ও সর্বসাধারণের শান্তি সংরক্ষণকারী ছিল।

এ চুক্তি মোতাবেক উভয় পক্ষ (কুরাইশ ও মুসলমানরা) একে অপরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করবে না অথবা তাদের নিজ নিজ মিত্রকে প্রতিপক্ষের মিত্রদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করবে না এবং উস্কানী দেবে না বলে স্থির হয়। এ চুক্তির পর থেকে দু’ বছর গত হয় এবং উভয় পক্ষ নিরাপত্তার সাথে ও সুখ-শান্তিতে বসবাস করছিলেন। এর ফলে মুসলমানগণ হিজরতের সপ্তম বর্ষে পূর্ণ স্বাধীনতাসহ পবিত্র বাইতুল্লাহ্ শরীফ যিয়ারতের জন্য পবিত্র মক্কা নগরী যান এবং হাজার হাজার মূর্তিপূজারী মুশরিক শত্রুর চোখের সামনে নিজেদের ইসলামী দায়িত্ব ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান আঞ্জাম দেন ।

অসহায় মুসলিম প্রচারকগণকে রোম সাম্রাজ্যের যে সব চর কাপুরুষোচিতভাবে হত্যা করেছিল, তাদেরকে দমন ও কঠোর শাস্তি প্রদান করার জন্য হিজরতের অষ্টম বর্ষের জমাদিউল আওয়াল মাসে মহানবী তিন জন ঊর্দ্ধতন মুসলিম সমরাধিনায়কের নেতৃত্বে তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী শামের সীমান্ত অঞ্চলগুলোয় পাঠান। মুসলিম সেনাবাহিনী এ সমরাভিযান থেকে নিরাপদে ফিরে আসতে পেরেছিল এবং মাত্র তিন জন অধিনায়ক ও কয়েকজন সৈন্য ছাড়া এ বাহিনীর আর কোন ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটে নি। তবে ইসলামের মুজাহিদদের কাছ থেকে যে সামরিক সাফল্যের আশা করা হয়েছিল, তা অর্জন ছাড়াই এ সেনাদল মদীনায় ফিরে আসে এবং তাদের এ অভিযানের বেশিরভাগই ‘আঘাত কর ও পালাও’ এ কৌশল-সদৃশ ছিল। কুরাইশ গোত্রপতিদের মাঝে এ সংবাদ প্রচারিত হবার ফলে তাদের সাহস বেড়ে যায়। তারা ভাবল, ইসলামের সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে গেছে এবং মুসলমানরা লড়াই করার মনোবল হারিয়ে ফেলেছে। এ কারণে তারা, বিরাজমান শান্ত পরিবেশ নষ্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমে তারা বনী বকর গোত্রের মাঝে অস্ত্র বিতরণ করে এবং তাদেরকে মুসলমানদের মিত্র খুযাআহ্ গোত্রের ওপর রাতের আঁধারে আক্রমণ করে তাদের একাংশকে হত্যা ও আরেক অংশকে বন্দী করার জন্য প্ররোচিত করে। এমনকি তারা এতটুকুতেও সন্তুষ্ট থাকে নি। একদল কুরাইশ রাতের বেলা খুযাআহ্ গোত্রের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। আর এভাবে তারা হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে দু’ বছর ধরে বিরাজমান শান্ত অবস্থাকে যুদ্ধ ও রক্তপাতে রূপান্তরিত করেছিল।

রাতের বেলা অতর্কিত এ হামলায় খুযাআহ্ গোত্রের ঘুমন্ত বা ইবাদত-বন্দেগীরত একাংশ নিহত এবং আরেক অংশ বন্দী হয়েছিলেন। খুযাআহ্ গোত্রের একদল লোক নিজেদের ঘর-বাড়ি ত্যাগ করে আরবদের কাছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল বলে বিবেচিত পবিত্র মক্কা নগরীতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। পবিত্র মক্কায় আসা শরণার্থীরা বুদাইল ইবনে ওয়ারকা র ঘরে গিয়ে নিজ গোত্রের হৃদয়বিদারক কাহিনী বর্ণনা করেছিলেন।

খুযাআহ্ গোত্রের অত্যাচারিত ব্যক্তিরা তাদের অত্যাচারিত হওয়ার বিষয়টি মহানবী (সা.)-এর গোচরীভূত করার জন্য নিজেদের গোত্রপতি আমর ইবনে সালিমকে মদীনায় মহানবীর কাছে পাঠান। তিনি মদীনায় পৌঁছে সরাসরি মসজিদে নববীতে চলে যান এবং জনতার মাঝে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক স্বরে খুযাআহ্ গোত্রের অত্যাচারিত অবস্থা ও সাহায্য প্রার্থনার কথা ব্যক্ত করে এমন একটি কবিতা আবৃত্তি করেন এবং মহানবী (সা.) খুযাআহ্ গোত্রের সাথে যে মৈত্রীচুক্তি করেছিলেন তাঁকে সেই চুক্তির মর্যাদা রক্ষার দোহাই দেন এবং মযলুমদের সাহায্য ও তাদের খুনের প্রতিশোধ নেয়ার আহবান জানান।

তিনি কবিতাটির শেষে বলেছিলেন :

هم بیّتونا بالوتیر هجّداً و قتلونا رکّعاً و سجّداً

“হে নবী! তারা মধ্যরাতে যখন আমাদের একাংশ ওয়াতীর জলাশয়ের কাছে নিদ্রায় আচ্ছন্ন এবং আরেক অংশ রুকূ-সিজদাহরত ছিল, তখন এ অসহায় নিরস্ত্র জনগণের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে হত্যা করেছে।”

এ কবি মুসলমানদের আবেগ-অনুভূতি এবং যুদ্ধ করার সাহস ও মনোবৃত্তি জাগ্রত করার জন্য বারবার বলছিলেন :قُتلنا و قد أسلمنا “ আমরা যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি, তখন (ঈমানের অবস্থায়) গণহত্যার শিকার হয়েছি।”

খুযাআহ্ গোত্রপতির এ ধরনের আবেগধর্মী, মর্মস্পর্শী ও উদ্দীপনা সঞ্চারী কবিতা তার প্রভাব রেখেছিল। মহানবী (সা.) বিশাল মুসলিম জনতার সামনে আমরের দিকে মুখ তুলে বলেছিলেন :“ হে আমর ইবনে সালিম! তোমাকে আমি সাহায্য করব।” এ অকাট্য নিশ্চয়তামূলক প্রতিশ্রুতি আমরকে অভিনব প্রশান্তি দিয়েছিল। কারণ তিনি নিশ্চিত ছিলেন, মহানবী শীঘ্রই এ ঘটনার কারণ কুরাইশদের থেকে খুযাআহ্ গোত্রের প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। তবে তিনি কখনোই ভাবতে পারেন নি, পবিত্র মক্কা বিজয় ও কুরাইশদের অত্যাচারী শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে এ কাজের পরিসমাপ্তি হবে।

অল্প সময়ের মধ্যে সাহায্য প্রার্থনা করার জন্য বুদাইল ইবনে ওযারকা খুযাআহ্ গোত্রের এক দল লোককে সাথে নিয়ে মদীনায় মহানবীর কাছে যান এবং তাঁর কাছে খুযাআহ্ গোত্রের তরুণ-যুবকদের হত্যা করার ব্যাপারে বনী বাকর গোত্রের সাথে কুরাইশদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন। অতঃপর তিনি মক্কার পথে রওয়ানা হয়ে যান।

মহানবী (সা.)-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদ্বিগ্ন কুরাইশরা

কুরাইশরা তাদের এ অন্যায়ের ব্যাপারে খুব অনুতপ্ত হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝতে পারে যে, তারা হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির বিপক্ষে একটা অন্যায় কাজ করে ফেলেছে এবং এভাবে তারা এ চুক্তি ভঙ্গ করেছে। এ কারণে তারা মহানবী (সা.)-এর ক্রোধ প্রশমন এবং দশ-সালা চুক্তিটির অনুমোদন ও দৃঢ়ীকরণ এবং আরেকটি বর্ণনামতে নবায়ন করার জন্য নিজেদের নেতা আবু সুফিয়ানকে মদীনায় প্রেরণ করে, যাতে সে যে কোনভাবে তাদের অন্যায় ও আগ্রাসনের বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়। সে মদীনার পথ ধরে যাত্রা করে এবং‘ আসফান’ নামক স্থানে মক্কাস্থ খুযাআহ্ গোত্রের নেতা বুদাইলের সাথে তার দেখা হয়। সে তাঁর কাছে জানতে চায়, তিনি মদীনায় ছিলেন কি না এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর কথা মহানবীর কাছে উত্থাপন করেছেন কি না? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, তিনি নিজ গোত্রের লোকদের সান্ত্বনা দেবার জন্য তাদের কাছে গিয়েছিলেন এবং কখনোই তিনি মদীনা গমন করেন নি। তিনি এ কথা বলেই পবিত্র মক্কার দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু আবু সুফিয়ান তাঁর উটের মলের মধ্যে মদীনার খেজুরের আঁটি দেখতে পায় এবং তা থেকে নিশ্চিত হয়ে যায়, বুদাইল মহানবীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন।

আবু সুফিয়ান মদীনায় প্রবেশ করে সরাসরি নিজ কন্যা উম্মে হাবীবার কাছে যায়। উল্লেখ্য, উম্মে হাবীবাহ্ মহানবী (সা.)-এর স্ত্রী ছিলেন। সেখানে সে মহানবীর তোষকের উপর বসতে চাইলে তার কন্যা তৎক্ষণাৎ তা গুটিয়ে ফেলেন। আবু সুফিয়ান তার মেয়েকে বলেছিল :“ তুমি কি বিছানাকে তোমার পিতার অনুপযুক্ত মনে করেছ, নাকি তোমার পিতাকে এর অনুপযুক্ত ভেবেছ?” তখন পিতার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন :“ এ বিছানা মহানবী (সা.)-এর, আর তুমি একজন কাফির। তাই আমি চাই না, একজন অপবিত্র-কাফির ব্যক্তি মহানবীর পবিত্র বিছানার উপর বসুক।”

এ উক্তি ঐ ব্যক্তির কন্যার যে পুরো বিশটি বছর ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে অনেকগুলো বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছে এবং অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু এ মহীয়সী নারী (উম্মে হাবীবাহ্) ইসলামের ক্রোড়ে এবং তাওহীদী আদর্শের ছায়ায় প্রশিক্ষিত হয়েছিলেন বলে তাঁর মধ্যে ধর্মের প্রতি ভালোবাসা এতোটাই প্রবল ছিল যে, অভ্যন্তরীণ প্রবণতা সত্বেও তিনি পিতা-সন্তানের মধ্যেকার আবেগকে তাঁর ধর্মীয় আবেগের কাছে অবনত করিয়েছিলেন।

আবু সুফিয়ান মদীনায় তার একমাত্র আশ্রয়স্থল কন্যার আচরণে খুবই মর্মাহত হয়, আর এ কারণেই সে তার বাসগৃহ ত্যাগ করে মহানবীর কাছে উপস্থিত হয়। সে মহানবীর কাছে হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি নবায়ন ও দৃঢ়ীকরণের বিষয়টি উত্থাপন করে। কিন্তু মহানবী কোন কথাই বললেন না। তাঁর নীরবতা প্রমাণ করে, তিনি আবু সুফিয়ানের কথার কোন গুরুত্ব দেন নি।

আবু সুফিয়ান মহানবীর কয়েকজন সাহাবীর সাথে যোগাযোগ করে যাতে তাঁদের মাধ্যমে আবার মহানবীর সাথে যোগাযোগ করে নিজ উদ্দেশ্য অর্জনে সফল হয়। কিন্তু এসব যোগাযোগ তার কোন উপকারেই আসে নি। অবশেষে সে আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর ঘরে গিয়ে তাঁকে বলেছিল :“ এ নগরীতে আপনারাই আমার সবচেয়ে নিকটতম আত্মীয়। কারণ আমার সাথে আপনাদের ঘনিষ্ঠ রক্ত-সম্পর্কের আত্মীয়তা আছে। তাই আমি আপনার কাছে অনুরোধ করছি যাতে আপনি মহানবীর কাছে আমার ব্যাপারে সুপারিশ করেন।” হযরত আলী (আ.) তার এ কথার জবাবে বললেন :“মহানবী যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, সে ব্যাপারে আমরা কখনোই হস্তক্ষেপ করি না।” সে হযরত আলীর এ কথা শুনে হতাশ হয়ে গেল। হঠাৎ সে আলী (আ.)-এর সহধর্মিনী মহানবীর কন্যা হযরত যাহরা (আ.)-এর দিকে তাকালো। তখন তাঁর নয়নের দ্যূতি হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর সামনে খেলায় ব্যস্ত ছিলেন। সে হযরত ফাতিমার আবেগকে নাড়া দেয়ার জন্য বলল :“ হে নবীকন্যা! আপনার সন্তানদেরকে মক্কার অধিবাসীদের আশ্রয় দেয়ার আদেশ দেয়া আপনার পক্ষে কি সম্ভব? আর এর ফলে যতদিন এ পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে, ততদিন তাঁরা আরবদের নেতা থাকবেন।” হযরত যাহরা আবু সুফিয়ানের অসৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন :“এ কাজ রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট এবং বর্তমানে আমার সন্তানদের এমন অবস্থাও নেই।” সে আবার হযরত আলীর দিকে তাকিয়ে বলল :“ হে আলী! আমাকে এ ব্যাপারে কিছু দিক নিদের্শনা দান করুন।” হযরত আলী তাকে বললেন :“ আমার চোখে কেবল এ পথ ছাড়া আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না যে, তুমি মসজিদে গিয়ে মুসলমানদেরকে নিরাপত্তা দানের ঘোষণা দেবে।”

আবু সুফিয়ান বলল :“ আমি যদি এ কাজ করি, তা হলে কি কোন উপকার হবে?” তিনি বললেন :“ খুব একটা উপকার হবে না। তবে এ কাজ করা ছাড়া আর কিছুই আমার দৃষ্টিতে আসছে না।” আবু সুফিয়ান আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর সত্যবাদিতা, সততা ও নিষ্ঠার ব্যাপারে জ্ঞাত ছিল বিধায় সে তাঁর প্রস্তাব মসজিদে নববীতে গিয়ে বাস্তবায়ন করল। এরপর সে মসজিদ থেকে বের হয়ে এসে উটের পিঠে আরোহণ করে মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা হলো। মক্কার কুরাইশ নেতাদের কাছে নিজের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে রিপোর্ট দেয়ার মাঝে হযরত আলীর প্রস্তাবের ব্যাপারে কথা উঠলে সে বলল :“আমি আলীর প্রস্তাব মোতাবেক মসজিদে গিয়েছি এবং মুসলমানদেরকে আশ্রয় দেয়ার ঘোষণা দিয়েছি।”উপস্থিত ব্যক্তিরা তাকে জিজ্ঞেস করল :“ মুহাম্মদ কি তোমার এ কাজ অনুমোদন করেছে?” সে বলল :“ না।” তারা বলল :“ আলীর প্রস্তাব ঠাট্টা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কারণ মহানবী তোমার আশ্রয় দানের ঘোষণার প্রতি মোটেই ভ্রূক্ষেপ করে নি। আর একতরফা চুক্তির কোন কল্যাণ নেই।” এরপর তারা মুসলমানদের ক্রোধ প্রশমনের অন্য পথ খুঁজে বের করার জন্য অনেকগুলো পরামর্শসভার আয়োজন করেছিল।

এক গুপ্তচর আটক

মহানবী (সা.)-এর জীবনেতিহাস থেকে এ পদ্ধতির সন্ধান পাওয়া যায় যে, তিনি সব সময় চেষ্টা করতেন যাতে শত্রু সত্যের সামনে আত্মসমর্পণ করে। আর তিনি কখনোই শত্রুর কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ ও তাকে ধ্বংস করার অভিপ্রায় পোষণ করতেন না।

যে সব যুদ্ধে তিনি নিজে অংশগ্রহণ করতেন, সেসবের অধিকাংশ ক্ষেত্রে বা যখন তিনি কোন সেনাদলকে যুদ্ধের জন্য প্রেরণ করতেন, তখন লক্ষ্য থাকতো শত্রুর ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করা, শত্রুপক্ষের সৈন্য সমাবেশ ও সংহতি বিনষ্ট করা এবং তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়া। তিনি ভালোভাবেই জানতেন যে, ইসলাম ধর্ম প্রচারের পথে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা হলে মুক্ত ও স্বাধীন পরিবেশে ইসলাম ধর্মের শক্তিশালী যুক্তি তার প্রভাব ফেলবেই এবং এ লোকগুলো- যাদের সামরিক সমাবেশ ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল,- তাদেরকে যদি নিরস্ত্র করা হয় এবং তারা যুদ্ধরত অবস্থার অবসান ঘটায় ও সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইসলামের ওপর বিজয় লাভ করার চিন্তা মনের মধ্যে লালন না করে, তা হলে তারা নিজেদের অজান্তেই মানব প্রকৃতি বা ফিতরাতের দিকনির্দেশনার দ্বারা তাওহীদবাদী ধর্মের দিকে আকৃষ্ট হবে ও ইসলামের সাহায্যকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।

এ কারণেই অনেক পরাজিত জাতি যারা ইসলামের সামরিক শক্তির কাছে পরাজয় বরণ করেছে এবং এরপর বিশৃঙ্খল-মুক্ত পরিবেশে ইসলামের সুমহান শিক্ষার প্রভাবে গভীর চিন্তা-ভাবনা করেছে, তারাই দীন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে এবং একনিষ্ঠভাবে এক-অদ্বিতীয় স্রষ্টার ইবাদতের ধর্ম প্রসার ও প্রচারকাজে আত্মনিয়োগ করেছে।

আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু মক্কা বিজয়েও এ সত্য পূর্ণ মাত্রায় প্রকাশিত ও বাস্তবায়িত হয়েছে। মহানবী (সা.) জানতেন, যদি তিনি পবিত্র মক্কা জয় করেন এবং শত্রুদের অস্ত্রমুক্ত করে পরিবেশকে মুক্ত ও শান্ত করেন, তা হলে অল্প দিনের মধ্যেই বর্তমানে ইসলাম ধর্মের ভয়ঙ্কর শত্রু এ দলটি সাহায্যকারী ও ইসলাম ধর্মের পথে মুজাহিদ হয়ে যাবে। অতএব, শত্রুর ওপর অবশ্যই বিজয়ী হতে হবে এবং তাকে পরাভূত করতেই হবে। তবে কখনোই তাদেরকে ধ্বংস করা বাঞ্ছনীয় নয়, আর যতদূর সম্ভব রক্তপাত এড়ানো উচিত। এ পবিত্র লক্ষ্য (বিনা রক্তপাতে শত্রুকে পরাজিত করা) অর্জনের জন্য শত্রুকে কিংকতর্ব্যবিমূঢ় করার মূলনীতি ব্যবহার করা উচিত। নিজেদের রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় সেনাবাহিনী সংগ্রহ করার চিন্তা-ভাবনা করার আগেই শত্রুপক্ষকে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে নিরস্ত্র করতে হবে।

শত্রুপক্ষকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করার মূলনীতি তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন ইসলামের যাবতীয় সামরিক রহস্য ও গোপনীয়তা সংরক্ষিত থাকবে এবং তা শত্রুর হস্তগত হবে না। মূলনীতিগতভাবে শত্রুপক্ষ জানবে না, মহানবী তাদের ওপর আক্রমণ করবেন কি না। আর যদি আক্রমণের চিন্তা-ভাবনা করা হয়ে থাকে, তা হলে তারা ঘূণাক্ষরেও অভিযান পরিচালনা করার উদ্দেশ্যে মুসলিম বাহিনীর যাত্রাকাল ও গতিপথ সম্পর্কে যেন অবগত না হয়। এর অন্যথা হলে এ সামরিক মূলনীতি বাস্তবায়িত হবে না।

পবিত্র মক্কা নগরী বিজয় শিরক ও মূর্তিপূজার সবচেয়ে সুরক্ষিত ও মজবুত দুর্গের পতন এবং কুরাইশদের যালিম প্রশাসন, যা ছিল তাওহীদবাদী ধর্মের প্রচার ও প্রসারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা, তা উচ্ছেদ করার জন্য মহানবী (সা.) রণপ্রস্ততির কথা ঘোষণা করেন। তিনি মহান আল্লাহর কাছে দুআ করেন, কুরাইশদের গুপ্তচররা যেন মুসলিম সেনাবাহিনীর যাত্রা ও গতিবিধি সম্পর্কে অবগত না হয়। মুহররম মাসের শুরুতেই মদীনা নগরীর আশে-পাশের অঞ্চলগুলো থেকে মদীনায় এক বিশাল সেনাসমাবেশ করা হয় যার বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা লিখেছেন :

তিন শ’ অশ্ব ও তিন পতাকা সমেত সাত শ’ মুহাজির যোদ্ধা, সাত শ’ অশ্ব ও অনেক পতাকা সমেত চার হাজার আনসার যোদ্ধা, এক শ’ অশ্ব,এক শ’ বর্ম ও তিন পতাকা সহ বনী মাযীনাহ্ গোত্র থেকে এক হাজার যোদ্ধা, বনী আসলাম গোত্র থেকে ত্রিশটি অশ্ব ও দু’ টি পতাকা সহ চার শ’ যোদ্ধা; জুহাইনা গোত্র থেকে পঞ্চাশটি অশ্ব ও চারটি পতাকা সহ আট শ’ যোদ্ধা, বনী কা’ ব থেকে তিনটি পতাকা সহ পাঁচ শ’ যোদ্ধা;সেনাদলের অবশিষ্টাংশ গিফার, আমাজা ও বনী সালীম গোত্রের যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত।

ইবনে হিশাম বলেন :“ মুসলিম বাহিনীর সেনাসংখ্যা দশ হাজারে উপনীত হয়।” এরপর তিনি আরো বলেন :“ বনি সালীম গোত্র থেকে সাত শ’এবং আরেকটি বর্ণনানুসারে এক হাজার যোদ্ধা, বনী গিফার গোত্র থেকে চার শ’ যোদ্ধা, আসলাম গোত্র থেকে চার শ’ যোদ্ধা, মাযীনাহ্ গোত্র থেকে এক হাজার তিন শ’ যোদ্ধা এবং বাকী অংশ মুহাজির, আনসার ও তাঁদের মিত্রগণ এবং বনী তামীম, কাইস ও আসাদ গোত্র থেকে কতিপয় লোকের সমন্বয়ে গঠিত।”

এ অভিযান বাস্তবায়িত করার জন্য পবিত্র মক্কা অভিমুখী সকল সড়কপথ ইসলামী হুকুমতের সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাগণের (সার্বক্ষণিক) নযরে রাখা হয়েছিল এবং শক্তভাবে সকল যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল। ইসলামী সেনাবাহিনী যাত্রা শুরু করার প্রাক মুহূর্তে হযরত জিবরীল (আ.) এসে মহানবী (সা.)-কে জানালেন, মুসলমানদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত এক সরলমনা লোক কুরাইশদের কাছে চিঠি লিখেছে এবং‘ সারাহ্’নামের এক মহিলার সাথে চুক্তি করেছে যে, কিছু অর্থ নিয়ে সে তার চিঠিটা কুরাইশদের কাছে পৌঁছে দেবে। আর সে ঐ চিঠিতে মক্কা নগরীর ওপর মুসলমানদের অত্যাসন্ন আক্রমণ চালানোর কথাও ফাঁস করে দিয়েছিল। সারাহ্ মক্কার গায়িকা ছিল এবং সে কখনো কখনো কুরাইশদের শোকানুষ্ঠানগুলোতে শোকগাঁথাও গাইত। বদর যুদ্ধের পরে মক্কায় তার কাজের প্রসার ও চাকচিক্য কমে গিয়েছিল। কারণ বদর যুদ্ধে কতিপয় কুরাইশ নেতা নিহত হয়েছিল এবং মক্কা নগরী জুড়ে তখন শোক ও দুঃখের মাতম চলছিল। এ কারণেই মক্কায় তখন গান-বাজনা ও আমোদ-প্রমোদের আসর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কুরাইশদের ক্রোধ ও শত্রুতার আগুন প্রজ্বলিত রাখতে এবং বদর যুদ্ধে নিহতদের প্রতিশোধ গ্রহণের অনুভূতি জনগণের মধ্য থেকে বিদূরিত না হওয়ার লক্ষ্যে শোকগাঁথা গাওয়া সর্বতোভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এ কারণেই বদর যুদ্ধের দু’বছর পর সে মদীনায় আসে। মহানবী (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন :“ তুমি কি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছ?” সে বলেছিল :“ না।” মহানবী তখন বলেছিলেন :“তা হলে তুমি এখানে কেন এসেছ?” সে উত্তরে বলেছিল :“ কুরাইশ আমার গোত্র ও বংশ। তাদের একদল নিহত হয়েছে এবং আরেকদল মদীনায় হিজরত করেছে। বদর যুদ্ধের পরে আমার পেশার পসার ও চাকচিক্য হারিয়ে গেছে। তাই আমি অভাবগ্রস্ত হয়ে ও প্রয়োজনের তাকীদেই এখানে এসেছি।” মহানবী তাকে পর্যাপ্ত পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাদ্য-দ্রব্য দেয়ার জন্য তাৎক্ষণিক নির্দেশ দিলেন।

সারাহ্ মহানবীর কাছ থেকে আনুকূল্য পাওয়া সত্বেও হাতিব ইবনে আবী বালতাআর কাছ থেকে মাত্র দশ দীনার নিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গুপ্তচর বৃত্তির দায়ভার গ্রহণ করে এবং মুসলমানদের মক্কা বিজয়ের প্রস্ততি গ্রহণের কথা ফাঁস করা তার পত্র কুরাইশদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।

মহানবী (সা.) তাঁর তিন বীরকে ডেকে নিয়ে তাঁদের দায়িত্ব দিলেন, তাঁরা মক্কার পথে অগ্রসর হয়ে এ গুপ্তচর নারীকে যেখানে পাবেন, সেখানে গ্রেফতার করে তার থেকে ঐ চিঠিটা উদ্ধার করবেন। মহানবী (সা.) এ অভিযানের দায়িত্ব হযরত আলী, যুবাইর ও মিকদাদকে প্রদান করেন। তাঁরা‘ রাওযাতু খাখ্’ নামক স্থানে ঐ নারী গুপ্তচরকে গ্রেফতার করে তাকে তল্লাশী চালান। কিন্তু তাঁরা তার কাছে কিছুই পেলেন না। অন্যদিকে ঐ নারী গুপ্তচরটি হাতিবের কাছ থেকে চিঠি নেয়ার কথা জোরালোভাবে অস্বীকার করে।

তখন হযরত আলী বললেন :“ মহান আল্লাহর শপথ! মহানবী কখনোই মিথ্যা বলেন না। তুমি চিঠিটা দিয়ে দাও। নইলে আমরা যে কোনভাবেই হোক, তোমার কাছ থেকে চিঠিটা উদ্ধার করব।”

সারাহ্ বুঝতে পারল, আলী এমন সৈনিক যিনি মহানবীর আদেশ বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত ক্ষান্ত হবেন না। এ কারণেই সে হযরত আলীকে বলল : “ একটু দূরে যান।” এরপর সে তার চুলের দীর্ঘ বেনীর ভাঁজের ভেতর থেকে চিঠি বের করে হযরত আলীর কাছে হস্তান্তর করে।

দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন মুসলমান, যে ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের ক্রান্তিকালে তাদের সাহায্যার্থে দ্রুত ছুটে যেত, সে এ ধরনের দুষ্কর্মে হাত দিয়েছে বিধায় মহানবী ভীষণ অসন্তষ্ট ও দুঃখিত হয়েছিলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি হাতিবকে ডেকে কুরাইশদের এ ধরনের তথ্য প্রদানের ব্যাপারে ব্যাখ্যা চাইলেন। সে মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নামে শপথ করে বলল :“ আমার ঈমানে সামান্য পরিমাণ দ্বিধা-সংশয় প্রবেশ করে নি। তবে মহানবী অবগত আছেন, আমি মদীনায় একাকী বসবাস করছি এবং আমার সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজনরা কুরাইশদের চাপ ও নির্যাতনের মধ্যে মক্কায় জীবন-যাপন করছে। আমার এ সংবাদ দেয়ার উদ্দেশ্য এই ছিল যে, কুরাইশরা কিছুটা হলেও যেন তাদের থেকে চাপ ও নির্যাতনের মাত্রা লাঘব করে।”

হাতিবের দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা থেকে বোঝা যায়, মুসলমানদের গোপন বিষয়াদি সংক্রান্ত তথ্য অর্জন করার জন্য কুরাইশ নেতারা মক্কায় তাদের (মুসলমানদের) আত্মীয়-স্বজনদের চাপের মুখে রাখত এবং তাদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা লাঘব করার ব্যাপারে শর্তারোপ করে বলত যে, তাদেরকে মদীনার মুসলমানদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত গোপন তথ্যাবলী সংগ্রহ করে তাদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তার দুঃখ প্রকাশ,ক্ষমা প্রার্থনা ও কারণ দর্শানো যথার্থ ও যুক্তিসংগত না হওয়া সত্বেও মহানবী তার অতীত কর্মকাণ্ড ও অবদানসমূহের মতো কতকগুলো কল্যাণের কথা বিবেচনা করে তার অজুহাত গ্রহণ করেন এবং তাকে মুক্ত করে দেন। এমনকি হযরত উমর মহানবী (সা.)-এর কাছে তার শিরচ্ছেদের আবেদন জানালে মহানবী বলেছিলেন :“ সে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে এবং একদিন সে মহান আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের পাত্র ছিল। এ কারণেই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু এ ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি না ঘটার জন্য এ প্রসঙ্গে কয়েক আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল :

) یا أیّها الّذین آمنوا لا تتّخذوا عدوّى و عدوّکم أولیاء.(

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না…”

মহানবী (সা.)-এর যাত্রা

অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে শত্রুপক্ষকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দেয়ার মূলনীতি রক্ষার জন্য যাত্রার নির্দেশ জারীর মুহূর্ত পর্যন্ত যাত্রা করার সময়কাল, গতিপথ এবং লক্ষ্যস্থল কারো কাছেই স্পষ্ট ছিল না। হিজরতের অষ্টম বর্ষের ১০ রমযান যাত্রার নির্দেশ দেয়া হয়। তবে মদীনার সকল মুসলমানকে পূর্ব থেকেই প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

মহানবী (সা.) মদীনা থেকে বের হওয়ার দিন আবু রহম গিফারী নামের এক লোককে মদীনায় তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে রেখে মদীনার অদূরে মুসলিম সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করতে যান। তিনি মদীনা থেকে একটু দূরে‘ কাদীদ্’ নামক স্থানে গিয়ে সামান্য পানি আনিয়ে রোযা ভঙ্গ করলেন এবং সবাইকে রোযা ভাঙার আদেশ দিলেন। অনেকেই রোযা ভাঙলেন, কিন্তু অল্প সংখ্যক ব্যক্তি মনে করল যে, তারা রোযা রেখে জিহাদ করলে তাদের পুরস্কার বা সওয়াব আরো বাড়িয়ে দেয়া হবে। সেজন্য তারা রোযা ভঙ্গ করা থেকে বিরত রইল।

এ সব সরলমনা লোক মোটেই ভাবে নি যে, যে নবী রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, সেই নবী আবার তাদেরকে রোযা ভঙ্গ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি যদি সৌভাগ্যের নেতা ও সত্যপথ প্রদর্শক হয়ে থাকেন, তা হলে তিনি উভয় অবস্থা এবং উভয় নির্দেশ দানের ক্ষেত্রেও জনগণের সৌভাগ্যই কামনা করবেন এবং তাঁর নির্দেশসমূহের মধ্যে কোন বৈষম্যের অস্তিত্ব নেই।

মহানবী (সা.) থেকে অগ্রগামী হওয়া অর্থাৎ তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এ ধরনের মনোবৃত্তি আসলে সত্য থেকে এক ধরনের বিচ্যূতি এবং তা আসলে মহানবী ও তাঁর শরীয়তের প্রতি এদের পূর্ণ বিশ্বাস না থাকার কথাই ব্যক্ত করে। এ কারণেই পবিত্র কুরআন এ ধরনের ব্যক্তিদেরকে ভর্ৎসনা ও তিরস্কার করে বলেছে :

) یا أیّها الّذین آمنوا لا تُقدّموا بین یدى الله و رسوله(

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে অগ্রগামী হয়ো না।” (সূরা হুজুরাত : ১)

আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব মক্কা নগরীতে বসবাসরত মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং তিনি গোপনে মহানবীকে কুরাইশদের (গৃহীত) সিদ্ধান্তগুলোর ব্যাপারে অবহিত করতেন। তিনি খাইবর যুদ্ধের পর ইসলাম ধর্মের ব্যাপারে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন; তবে কুরাইশ নেতাদের সাথে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় ছিল। তিনি সর্বশেষ মুসলিম পরিবার হিসেবে পবিত্র মক্কা ত্যাগ করে মদীনায় বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। আর মহানবী (সা.) মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হওয়ার দিনগুলোয়ই তিনি মদীনার দিকে রওয়ানা হয়েছিলেন এবং পথিমধ্যে জুহ্ফাহ্ অঞ্চলে মহানবীর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল। মক্কা বিজয়কালে আব্বাসের উপস্থিতি অনেক কল্যাণকর এবং উভয় পক্ষের জন্য উপকারী হয়েছিল। আর তিনি না থাকলে হয় তো কুরাইশদের প্রতিরোধবিহীন অবস্থায় মক্কা বিজয় সম্পন্ন হতো না।

এ দৃষ্টিকোণ থেকে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশেই তাঁর মক্কা ত্যাগ করে মদীনা অভিমুখে যাত্রা করা মোটেই অসম্ভব নয় যাতে করে তিনি এর মধ্যে তাঁর শান্তিকামী ও মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হন।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *